Saturday, 11 November 2017

চার আনার ছইমুদ্দিন: স্মৃতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

দিন যায়, রাত আসে, সপ্তাহ-মাস-বছর গড়িয়ে যায়। সময়ের স্রোতে আমরা প্রতিনিয়ত ভেসে চলি। এই চলার পথে স্মৃতির পাল্লা ভারি হতে থাকে। হাজারো স্মৃতির ভিড়ে কিছু স্মৃতি শুকতারার মতো জ্বলজ্বল করে ওঠে। তেমনই এক স্মৃতির নক্ষত্রের নাম ছইমুদ্দিন।



কয়েকদিন ধরে বিদেশি একটি স্কুলে কাজের সুবাদে বারবার ছইমুদ্দিনের কথা মনে পড়ছে। এই বিদেশি স্কুলে প্রতিদিন স্যুট-টাই পরা ছেলেমেয়েরা মার্সিডিজ-বিএমডব্লিউ গাড়ি চড়ে আসে। ক্লাসের পর ভেন্ডিং মেশিনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে তাদের খাবারের লোভে। এইসব দৃশ্য দেখলেই আমার ছোটবেলার সেই ছইমুদ্দিনের মুখটা ভেসে ওঠে।

আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল বাড়ির কাছেই। মাটির দেওয়ালে ইটের গাঁথুনি, উপরে টিনের ছাউনি। একটাই বড় ঘর, তার ভেতরেই সব ক্লাস। বাড়ি থেকে বস্তা নিয়ে গিয়ে বসতাম। এক কোণে ক্লাস ওয়ান, অন্য কোণে ক্লাস টু। ক্লাসের মাঝেই চলে আসত বড়োরা – ক্লাস থ্রি, ফোর, ফাইভ। জায়গা দখলের জন্য মাঝেমধ্যে হট্টগোল বেঁধে যেত। তবে এইসব হট্টগোল পেরিয়ে দৈনিক সমাবেশের ঠিক আগেই চলে আসত আমাদের প্রিয় ছইমুদ্দিন।

মাথায় গামছার বেড়ি দিয়ে বাঁশের ডালিতে ভরা রকমারি খাবার নিয়ে ছইমুদ্দিন স্কুলে ঢুকত। তার আসার আগেই ছেলেমেয়েরা ছুটে গিয়ে তাকে ঘিরে ধরত। মনে হতো, কোনো বড় নেতা যেন মঞ্চে আসছেন। আমাদের সেই ‘নেতা’ ছইমুদ্দিনের ডালিতে কি ছিল না! বাদাম ভাজা, কাবলি বুট, ভুট্টার খৈ, রসালো বুন্দিয়া, জিলাপি – এক ডালিতে এত কিছু! চার আনার ভুট্টার খৈয়ে আমাদের হাফপ্যান্টের পকেট ভরে যেত।

দশ পয়সা, বিশ পয়সায় অনেক কিছুই কেনা যেত ছইমুদ্দিন কাকার কাছ থেকে। কেউ পাঁচ পয়সা নিয়ে গেলেও খালি হাতে ফিরে আসত না। শুধু আমাদের স্কুল নয়, মহেশপুর থেকে সিদ্দিশি পর্যন্ত সব স্কুলেই ছইমুদ্দিনের ছিল অবাধ বিচরণ। শিশুরা ছিল তার প্রাণ। তিনটি স্কুলে যাওয়ার এই রুটিন যেন তার জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছিল।

ছইমুদ্দিন ছিল আমাদের ছোটবেলার হিরো। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি হারিয়ে গেলেন। কোথায় গেলেন, কিভাবে গেলেন, কেউ জানল না। আরো আশ্চর্যের বিষয়, আমরা তাকে খুব দ্রুত ভুলেও গেলাম। সময়ের স্রোতে হাজারো স্মৃতি চাপা পড়ে যায়, কিন্তু কিছু স্মৃতি চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকে। চার আনার সেই ছইমুদ্দিন কাকা আমার স্মৃতির পাতায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

আজ এত বছর পরও, বিদেশি এই চাকচিক্যের মাঝেও, ছইমুদ্দিনের কথা মনে পড়ে। তার সরলতা, তার ভালোবাসা, আর শিশুদের প্রতি তার অগাধ মমতা – এসব যেন সময়ের স্রোতকে উপেক্ষা করে আমার স্মৃতির আকাশে শুকতারা হয়ে জ্বলছে।

Saturday, 8 October 2016

স্মৃতির পূজা এখনো অমলিন

হোয়াটসঅ্যাপে খুব সকালে তুলি আমাকে শিউলি ফুলের ছবি পাঠিয়েছে। চোখ বন্ধ করে কল্পনায় ছবি থেকে শিউলির গন্ধ শোকার পাগলামি করেই ওকে ফোন দিলাম।

'কিরে কই থেকে কুড়লি ,চেয়ারম্যানের সেই শিউলি ফুলের গাছটি এখনো কি আছে ?' তুলি বললো -
'ধুস ঐটা কবেই কেটে ফেলেছে ,এটা আমাদের বাড়ির গাছ। তুলসী তলায় যেটি লাগিয়েছিলাম   এই প্রথম ফুল ফুটেছে।সকালে উঠে দেখি তুলসী তলা শিউলিফুলে সাদা হয়ে গেছে। তুমি পুজোয় আসছো তো ?'
'আমি বললাম কবেরে দূর্গা পূজা ?'
'এমা তুমি জানোনা ,গতকাল মহালয় হয়ে গেলো। আমরা সবাই টিভিতে দেখলাম। জানো মেজদাদা মহালয়ায় এবার ষ্টার জলসায় আর জি বাংলায় দূর্গা কে সেজেছে ?......'
ও বলে চলেছে ,আমি লাইন কেটে দিলাম।
এরই মধ্যে শরৎ চুপি চুপি চলে এসেছে টের পাইনি। এই ইট কাঠ পাথরের শহরে সময়গুলো ঠিকই তার নিজের গতিতে চলে যায় ,আমরা কেউ বুঝতেই পারিনা। বাংলাদেশ থেকে সম্পুর্ন্ন ভিন্ন প্রকৃতি মালয়েশিয়ার। সারাবছর একটিই ঋতু। প্রায়ই দেখি বিলাই কুকুরের বৃষ্টি তারপর আবার ফঁকফঁকা। এখানে শারদ আসেনা কাঁশবনে সাদা ফুলের ঢেউ খেলানো বাতাস কিংবা সুরভিত শিউলির গন্ধ নিয়ে। হেমন্ত আসেনা কৃষকের কাস্তে হাতে রোদে পোড়া মুখের এক চিলতে হাসি নিয়ে। ভাঁপা পিঠা পুলির শীতের রাত কিংবা আমের মুকুলের মৌ মৌ গন্ধে ভ্রমর গুঞ্জরনে আর শিমুল কৃষ্ণচূড়ার লাল হাঁসিতে আসেনা বসন্ত।কিন্তু ঋতু চক্রের আবর্তে ছয় ঋতুর দেশে শারদ তার নিজস্য স্বভাব নিয়ে হাজির আর তার সাথে হাজির বাঙালির চিরন্তন ধর্মীয় উৎসব দূর্গা পূজা।এই উৎসব শুরু হতো মহালয়ার মাধ্যমে।আর মহালয় মানে ছিল শিশির ভেজা ভোরে আকাশবাণী থেকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কন্ঠে মহিষাসুরমর্দিনী তথা চন্ডি পাঠ।কতদিন শুনিনি উদাত্ত কন্ঠে সেই চন্ডি পাঠ অথচ এক সময় সারাবছর অপেক্ষা করতাম তার কন্ঠে  মহিষাসুর মর্দিনী শুনবো বলে। ভোরবেলা সাড়ে চারটার আগে ঘুম থেকে উঠে বাবার ন্যাশনাল প্যানাসনিক রেডিওতে  আকাশবাণী টিউন করে বসে থাকতাম গায়ে চাদর জড়িয়ে মাদুর পেতে। মহালয়া শুরু হলে ফুল ভলিউমে শুনতাম অন্যদেরও শুনাতাম। মূলত এই দিন থেকে শুরু হতো আমাদের দূর্গা পূজার আনন্দ। সেদিন থেকে মা'র কাছে বার বার জানতে চাইতাম কবে পূজার জামা কাপড় কিনতে যাচ্ছি ফুলবাড়ীতে।মা নারিকেল কুরে নাড়ু বানায়,মুড়ি মুড়কি ,মোয়া তৈরিতে ব্যাস্ত থেকেও আমার কথার উত্তর দেয় বলে- 'এইতো পাট বিক্রি হলেই যাবো।' আমাদের আবদার ছিল মা কেন্দ্রিক। বাবা ছিল প্রচন্ড রাগী তাই মা বাবাকেও কোনো কিছু বলতে সাহস পেতো না। বাবার আশেপাশে ঘুরা ঘুরি করলেও টের পেতাম না তার মনের কথা ,ভাবতাম বাবার হয়তো এমনই হয়। মা ছাড়াও আরো দুইজন ছিল যাদের কাছে আমরা ভয়ডরহীন সব কিছু বলতে পারতাম এক প্রবাস জ্যাঠা আর অন্যজন ভজা দা। দুইজনেই আমাদের অনেক পুরোনো কাজের লোক। ভজাদাকে জিজ্ঞেস করতাম-
'পাটের দাম কি বেড়েছে ,কবে আমাদের পাট বিক্রি করতে নিয়ে যাবে ?
ভজা'দা আমাদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়া কথা বলতো -
'এবার কোনো পাট বিক্রি হচ্ছে না কেননা পাটের দাম নেই ,তাই এবার আর হাটে পাট নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না।'
আমি বিমর্ষ হয়ে মা দূর্গা কে ডাকতাম। মন প্রাণ দিয়ে ডেকে বলতাম-
'মা দূর্গা পাটের দাম বেড়ে দাও নইলে পুজোর জামা কাপড় কেনা হবেনা ,আর নতুন জামা কাপড় না পরে মামার বাড়িতে পুজো দেখতে কিভাবে যাবো ?ময়নাদি,হাসি,পাপ্পু,পঞ্চম,কেয়া ওরা কত সুন্দর সুন্দর পুজোর জামা পরে ঘুরবে আর আমি ?
মা দূর্গা প্রতি বছর আমার কথা শুনতো। পাটের দাম বাড়ুক আর না বাড়ুক প্রতি বছর ঠিকই আমাদের পাট বিক্রি হতো। রাতে ডিসপেনসারি থেকে বাবা ,প্রবাস জ্যাঠা,ভজা দা একসাথে ফিরলে শুরু হতো পাট মাপা। হারিকেন জ্বালিয়ে পাট মেপে মেপে সেগুলোকে সুন্দর করে ভাঁজ করে বাধা হতো।মাপামাপি শেষ হলে প্রবাস জেঠা গরুর গাড়ির চাকা লাগিয়ে ঠিক থাকে করে রেখে চলে যেত। ভোরবেলা অন্ধকার থাকতেই বাবা আর প্রবাস জ্যাঠা রওনা দিতো হাটে। পরেরদিন বাবা আমাদের নিয়ে যেত জামা কাপড় কিনতে। সবার জন্য একসেট জামাকাপড় কিনলেও বাবা কখনোও নিজের জন্য কিনতো না।আমাদের গ্রামের আশেপাশে কোথাও পূজা হতোনা। তাই আমাদের পূজা ছিল মামাবাড়ি কেন্দ্রিক। যেদিন  চার পুত্র-কন্যা নিয়ে হিমালয় থেকে পিতৃলোকে মর্ত্যে গমন করে দেবী দূর্গা ঠিক তখন আমার মা'ও আমাদের কে নিয়ে তার বাপের বাড়িতে রওনা দিতো।দেবী দুর্গার মতো চারটি বাহন ছিলোনা, বাহন বলতে মামা বাড়িতে যাওয়ার একটিই পথ ছিল সহজ তা হচ্ছে দুই মাঝি আলা ছৈয়ের নৌকা। স্রোতস্বিনী ছোট যমুনার স্রোতের বিপরীতে সারাদিন দাঁড় বেয়ে চলত সেই নৌকা। আমি বড় বড় চোখে নদীর দুই পারে সাদা কাশফুলের বন ,ঘন জঙ্গল আখ ক্ষেত,জেলেদের ডিঙি নৌকায় মাছ ধরা ,নদীর পারে ছোট ছোট গ্রামের দুরন্ত ছেলেমেয়েদের উঁচু পার থেকে লাফিয়ে পড়া আর দূর কোনো গ্রামের পুজো মন্ডপ থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দ শুনতে শুনতে সন্ধ্যের আগেই পৌঁছে যাই গোপালপুর মামা বাড়িতে।নৌকা থেকে নেমেই দৌড়ে যেতাম পূজা মন্ডপে। সাদামাটা সেই পূজা মন্ডপ রঙিন কাগজ আর বাহারি বেলুন দিয়ে সাজানো টিনের ছাপড়ার সেই মন্দির আলোকিত  হতো হ্যাজাক কিংবা জেনারেটরের আলোয়। স্মৃতির সেই পূজা এখনকার লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যায়ে সেই পুজোকে ম্লান করতে পারেনি কখনোই ।

Thursday, 8 September 2016

পারফিউম -একজন খুনীর গল্প

সুরের যেমন সাতটি মৌলিক নোট আছে ,যা দিয়ে তৈরী হয় শ্রুতি মধুর নানা সুর, তেমনি রং এর ও রয়েছে কয়েকটি মৌলিক রং। তা দিয়েই চিত্র শিল্পীরা তৈরী করে নানা ধরনের চিত্রকর্ম। অনুরূপ পারফিউমের রয়েছে নিজস্ব মৌলিক কিছু স্তর বা নোট। টপ নোট ,মিডল বা হার্ট নোট ,বটম বা বেজ নোট আর ব্রিজ। কয়েকটি সুগন্দির মিশ্রনে তৈরী হয় পারফিউম। প্রথমে টপ নোট নাকে এসে ধাক্কা দিয়ে মনকে উতলা করে তারপর ধীরে ধীরে বেজ নোটের সহায়তায় তা ছড়িয়ে পরে। এই বেজ বা বটম নোট হল সুগন্ধির ভিত্তি আর ব্রিজ এর কাজ পারফিউমকে বিভিন্ন সময়ে সন্তরনে সহায়তা। পারফিউম এক্সপার্ট ছাড়া সুগন্ধির এই নোট ধরা আমাদের সম্ভব নয়। এরকমই এক গন্ধ বিশারদ তৈরী করে ফেলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পারফিউম ,তাও আবার মানুষের শরীর থেকে। অ্যাম্বারগ্রিজ বা তিমি মাছের বমি কিংবা হরিণের নাভিমূল কস্তুরী থেকে পৃথিবীর সেরা পারফিউমগুলো তৈরী হয় সবাই জানে কিন্তু মানুষের দেহ থেকে ? বাস্তবে অসম্ভব হলেও সেলুলয়েডের ফিতায় তা সফল ভাবে করে দেখিয়েছে জার্মান পরিচালক টম টাইকার।  সিনেমাখোর রূপক আমাকে কয়েকটা লিস্ট ধরিয়ে দিয়ে প্রথমেই এই পারফিউম মুভিটা দেখতে বলে। ২০০৭ সালে কোনো এক পত্রিকায় পড়েছিলাম এই সিনেমার কথা। ধরেই নিয়েছিলাম শেষ দৃশ্যে যেহেতু কয়েকশো মানুষের নগ্ন দৃশ্যে জুড়িয়ে দিয়েছে পরিচালক সেহেতু ওটা ১৮+ দের সিনেমা ।মাঝখানে দীর্ঘ বিরতির পর যখন মুভিটি দেখতে বসি একবার মনে হচ্ছিলো এটি একটি আধো ভৌতিক সিনেমা পরক্ষনে মনে হচ্ছিলো এটি একটি সিরিয়াল কিলারের কাহিনী ,তারপর দেখি অদ্ভুত এক প্রখর ইন্দ্রিয় অনুভূতির গল্প। প্যাট্রিক সাসকাইন্ড তার বিখ্যাত উপন্যাস 'পারফিউম' অবলম্বনে টম টাইকার  তৈরী করে ১৪৭ মিনিটের তার সেরা মুভি পারফিউম দ্যা স্টোরী অব আ মার্ডারার।  প্রযোজক ব্রেন্ড ইঞ্চিণজার মূল কাহিনী সাসকাইন্ডের কাছ থেকে কেনার পরই বিরকিন কে নিয়ে চিত্রনাট্য লিখে ফেলে। কিন্তু মূল চরিত্র খুঁজে না পাওয়ায় নির্মাণ করতে অনেকটা সময় চলে যায়। অনেক যাচাই বাছাইয়ের পর ২০০৫ সালে স্পেন ,জার্মানি এবং ফ্রান্সের লোকেশনে চিত্রধারণ শুরু হয়। সেই সময় জার্মানির সর্বোচ্চ বাজেটে ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে নির্মিত হয় পারফিউম দ্যা স্টোরী অব আ মার্ডারার।
গ্রানুইলির চরিত্রে রূপদানকারী বেন উইসশো সম্পূর্ন চরিত্রটিকে তুলে ধরেছেন অসাধারন দক্ষতায়।বিশাল মাছের বাজার, প্রচুর মানুষ আর পোষাক আর অসাধারন সিনেমাটোগ্রাফি খুব সহজেই আঠারোশ  শতাব্দীর ফ্রান্সকে ফুটিয়ে তুলেছেন টম টাইকার২০০৬ সালে মুক্তির পর এটি আয় করে নেয় ১৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
১৪৭ মিনিটের এই মুভিটির শুরুতে দেখি প্যারিসের এক মাছ বাজারের মধ্যে জন্ম নেয়া গ্রানুইলিকে তার মা অনাদরে ফেলে রেখেছিল জন্মের পরই মারা যাবার জন্য।কেননা পিতৃপরিচয় দেওয়ার মত কোনো কিছু ছিলোনা ওই মহিলা জেলের। ঘটনাচক্রে সেখানে মাছ কিনতে আসা এক পুলিশ কর্মকর্তা সদ্য ভুমিষ্ট গ্রানুইলের কান্নার আওয়াজ শুনতে পায়।কিন্তু মাছের আড়তে জন্ম নেওয়া ছোট্ট গ্রানুইল না মরে ফাঁসির দড়িতে মরতে হয় তার মাকে। গ্রানুইলের ঠাঁয় হয় এতিমখানায়।আষ্টে গন্ধওয়ালা মাছের আড়তে জন্ম নেওয়া গ্রানুইল পায় গন্ধ শোকার এক বিশেষ ক্ষমতা।১৭ বছর এতিমখানায় থাকার পর তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয় এক চামড়ার কারখানায়।কঠোর পরিশ্রমে কেটে যাওয়া গ্রানুইল খুঁজে ফেরে সবকিছুর গন্ধ এমনকি জলের তলের গন্ধও সে বুঝে ফেলে এক নিমিষেই। ঘটনা চক্রে একদিন সে সময়কার প্যারিসের নামকরা পারফিউম ব্যাবসায়ী বালদিনির সাথে।বালদিনি তাকে সেই চামড়া ব্যাবসায়ীর কাছ থেকে চড়া দামে কিনে নেয়। গ্রানুইল তার বর্তমান মনিবের কাছ থেকে সুগন্ধি বানানোর প্রক্রিয়া শেখার পর সে তৈরী করতে থাকে নানা প্রকারের পারফিউম আর অন্যদিকে বালদিনি উপার্জন করতে থাকে কাড়ি কাড়ি টাকা। একদিন সে পারি জমায় গ্রাসের উদ্দেশ্যে যেখানে তৈরী হয় পৃথিবীর বিখ্যাত সব সুগন্ধি। বিশাল সব ফুলের বাগান হাজারো শ্রমিকের শ্রমে তৈরী হচ্ছে সুগন্ধি সমূহ।সে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সুগন্ধি আবিষ্কার করবে। সুন্দর সুগন্ধি আবিষ্কারের নেশা তাকে পেয়ে বসে । একটার পর একটা চেষ্টা সে করে যেতে থাকে সে কিন্তু তার মনঃপুত হয়না কোন সুগন্ধি । একসময় সে আবিষ্কার করে নারীদেহের এক মোহনীয় সুগন্ধ।তার ধ্যান জ্ঞান হয়ে দাঁড়ায় সুন্দরী কুমারী নারীদেহ থেকে কিভাবে সেই সুগন্ধকে ধরে রাখবে। টাকার বিনিময়ে অনুমতিক্রমে এক নারীর শরীর থেকে সুগন্ধি তৈরী করতে চায় কিন্তু তাতে সেই নারী রাজি না হলে তাকে হত্যা করে এবং বিশেষ এক গাদের সাহায্যে শরীর থেকে চেঁছে নেয় শরীরের নির্যাস আর তৈরী করে সুগন্ধি। হয়ে উঠে এক সিরিয়াল কিলার। শহর জুড়ে শুধু কুমারী মেয়েরা নিখোঁজ হতে শুরু করলো এবং তাদের নগ্ন লাশ বিভিন্ন জায়গায় পরে থাকতে লাগলো। শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে , যারই ঘরে কুমারী মেয়ে আছে তার মাঝেই কোনপ্রকার স্বস্তি নেই । একের পর এক হত্যা , অনেকভাবে চেষ্টা করেও কোনো কুলকিনারা করে উঠতে পারছেনা।এদিকে শহরের প্রধান তার কুমারী মেয়েকে নিয়ে আতঙ্কে আছে।গ্রানুইল তার সেরাটা তৈরী করার শেষ পর্যায়ে আসে। তার আর প্রয়োজন একটি কুমারী মেয়ের এবং তার নজর পরে শহর প্রধানের সুন্দরী মেয়ের দিকে। কিন্তু শহর প্রধান  তার মেয়েকে নিয়ে বহুদূরে চলে যায়। দূর থেকে গন্ধ শুকে গ্রানুইল ঠিকই হাজির হয় তাদের কাছে। শহর প্রধান নিরাপদ স্থানে চলে গিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেনা তার একমাত্র মেয়েকে। গ্রানুইল যখন তৈরী করে ফেলে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পারফিউম ঠিক তখুনিই সে ধরা পরে যায় রক্ষীদের হাতে। হাজার হাজার জনতা তার প্রকাশ্য ক্রূশ বিদ্ধ করা দেখতে এসেছে আর গ্রানুইল তখন তার সেই নিজের কাছে লুকিয়ে রাখা পারফিউমের মুখ খুলে ফেলে। তারপর!!!
তারপর কি হলো জানতে চাইলে দেখতে পারেন পারফিউম: দ্যা স্টোরী অব আ মার্ডারার।
ছোট্ট গ্রানুইলের গন্ধ শুকা
  

Sunday, 4 September 2016

রবার্ট দ্য ডল-একটি অভিশপ্ত পুতুল

পুচকি ন্যান্সি অনেক বড় হয়ে গেছে। এখন সে ক্লাস ফোরে পড়ছে। গত তিন বছর থেকে তার একটাই চাওয়া বড় একটি বার্বি ডল। গত ডিসেম্বরে একটি ট্যাব কিনে সেটার মধ্যে হরেকরকমের কার্টুন গেম আর ছোটদের ইংরেজি শেখার অ্যাপস ডাউনলোড করে দেয় যাতে করে পুতুল নিয়ে খেলার চিন্তা ভুলে যায়। অনেকদিন পর গতকাল ফোন দেই ,দিয়েই শুনি সেই পুরোনো গান -দাদা কবে আসছো ?আমার বার্বি ডলের কথা তোমার মনে আছে? সত্যি কথা বলতে ব্যাক্তিগত ভাবে আমি ছোটদের হাতে এই খেলনা পুতুল ,পিস্তল  খেলনা হাড়ি -পাতিল নিয়ে খেলা একদম পছন্দ করিনা। আমার কাকা ডাঃবিকাশরঞ্জন দাস বলতো ,শিশুদের হাতে এসব খেলনা এলেই নাকি তাদের মধ্যে বিরাট পরিবর্তন আসে এবং তারা ছোট থেকেই সেসবের স্বপ্ন দেখতে দেখতে বড় হয়। কতটুকু সত্য আজকে একটু হলেও দেখছি। সেই কাকুর ছেলে তুনক সারাদিন বিমান নিয়ে খেলত। তার দখলে ছিল রাজ্যের সব খেলনা  প্লেন। ছোট্ট তুনক এখন অনেক বড় হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম সে এখন কানাডার মাউন্ট রয়েলে এভিয়েশন নিয়ে পড়ছে। আমার বোন রুমি যার ডজন ডজন খেলনা পুতুল ছিল। পুতুলের বিয়ে দেওয়া ,পুতুল সাজানো নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যেত।  এখন নিজের সুন্দর সংসার আর নিজের পার্লার নিয়ে ব্যাস্ত। আর পাশের বাড়ির রুবেল শুনেছি এখন সে এলাকার মাস্তান। আমরা বড় হয়েছি লোকজ আর মৌসুমী খেলা গোল্লার ছুট,ডাংগুলি ,লুকোচুরি ,লাঠিম আর ঘুড়ি উড়েই বড় হয়েছি। এসব খেলনা এখন অতীত। এখনকার হরেকরকমের খেলনা যেমন আছে তাদের নামের বাহার তেমনি নামি  দামি বিভিন্ন ব্র্যান্ড। ন্যান্সির বার্বি ডল হয়তো এরকমই একটি ব্র্যান্ড। বার্বি ডল কিংবা কোনো পুতুলের কথা আসলেই আমার ভয়ঙ্কর  ভুডু বা ব্ল্যাক ম্যাজিকের কথা মনে পরে যায়, একটি পুতুল রবার্ট অন্যটি অ্যানাবেল। হলিউডের জনপ্রিয় মুভি চুকি আর দ্য কনজুরিং সিনেমার বদৌলতে রবার্ট দ্য ডল আর অ্যানাবেল কে সবাই চেনে। এই  দুই পুতুল এখনো একটি অমীমাংসিত রহস্য। কারো কারো কাছে স্রেফ গাঁজাখুরি গল্প আবার কারো কাছে ভয়ঙ্কর কালোবিদ্যা বা ভুডুজম। এই ভুডুজম কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্স শহরে ভুডু জাদুঘর যা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
মনে করা হয় ১৭১৯ থেকে ১৭৩১ সালে আফ্রিকা এবং হাইতি থেকে ধরে আনা কৃষ্ণাঙ্গ দাস-দাসীদের মাধ্যমে সভ্য জগতে ভুডু চর্চার আবির্ভাব হয় এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্স শহরকে ভুডু চর্চার পীঠস্থান বলা হয়ে থাকে। কথিত আছে হযরত মুহাম্মদ(সা:) এর বিরোধী পক্ষরা তার পুতুল প্রতিমূর্তি তৈরী করে তাতে সুচ ঢুকিয়ে মন্ত্রপূত করার পর সেটা রেখে দিয়েছিলো মরুভূমির এক কূপের মধ্যে ,এতে করে মুহাম্মদ(সা:) শারীরিকভাবে অসুস্থ অনুভব করেছিল এবং সেই পুতুল উদ্ধারের মাধ্যমে তিনি অসুস্থ অবস্থা থেকে মুক্তিলাভ করেন ,এমনটিই জানা যায় বিভিন্ন ইসলামিক বই থেকে।
ভুডু পুতুল  তৈরী করা হয় দুই টুকরো কাঠি ,কাপড়চোপড় এবং এটি যার উপর প্রয়োগ করা হবে ,সেই ব্যাক্তির চুল ,নখ ,রক্ত বা চামড়ার কিছু অংশ দিয়ে। শোনা যায় যে ভূডূবিদ্যার সাহায্যে কবরের লাশ নাকি জ্যান্ত করে তাকে দিয়ে গোলামের মত খাটানো যায়। (এসব সোনা কথা বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস একান্তই আপনার বিষয়)।  ধারণা করা হয় কিংবদন্তি ভয়ঙ্কর পুতুল রবার্ট কিংবা অ্যানাবেল তৈরী হয়েছে ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ানদের হাতে। রবার্ট দ্য ডল বা ভুতুড়ে পুতুল বর্তমানে ওয়েস্ট ফ্লোরিডা মার্টেল্লো যাদুঘরে রয়েছে।আর অন্যদিকে অ্যানাবেল রয়েছে ওয়ারেন এর অকাল্ট মিউজিয়াম। রবার্ট দ্য ডলের অশুভ প্রভাব বিস্তার শুরু গত শতাব্দীর গোড়ার দিকে ১৯০৬ সালে। যখন শিল্পী রবার্ট ইউজেন অটো ফ্লোরিডা শহরের কেন্দ্রে বিখ্যাত আর্টিস্ট'স হাউস এ বসবাস শুরু করেন।প্রচুর বিত্তশালী ছিল অটো পরিবার।ফ্লোরিডার জীবনে বেশ মানিয়ে গেলেন তারা। স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে এই বাড়িতে থাকত তাদের ছোট্ট ছেলে আর বেশ কিছু চাকর বাকর। অটোরা নিয়ম কানুনের ব্যাপারে খুব কড়া ছিলেন।একদিন মিসেস অটোর বিছানায় বসার জন্য চাকরি গেল জ্যামাইকান সেবিকার। তবে যাবার আগে গেনেকে সে দিয়ে গেল হাতে বোনা একটা স্টাফ করা পুতুল।লোকে বলে জ্যামাইকান এই নারী ভুডু আর কালো জাদুর কৌশল জানত। পুতুলটা বানানো হয় গেনের চেহারার আদলে।ছোট্টগেনে খুব পছন্দ করলো সেটি। পুতুলটার নাম দেওয়া হলো রবার্ট,গেনের নামেরই প্রথম অংশ এটা। জ্যামাইকান সেবিকার কাছ থেকে পুতুলটা নেওয়ার পর থেকে আর ওটাকে এক মুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল হতে দিল না ছোট্ট গেনে। সবজায়গাতেই পুতুলটাকে নিয়ে যাওয়া চাই তার।শহরের লোকেরা প্রায়ই মিসেস অটো আর ব্যক্তিগত পরিচারকদের সঙ্গে গেনে আর রবার্টকে শহরে ঘুরে বেড়াতে দেখতে লাগল। খাবার সময় গেনের পাশেই নিজের ছোট্ট চেয়ারটায় বসে রবার্ট।রাতে ঘুমে ঢুলতে থাকা ছেলেটার পাশে শুইয়ে দেওয়া হয় রবার্টকে।তবে ধীরে ধীরে গেনে আর তার পুতুলের সম্পর্ক একটা অশুভ দিকে মোড় নিল। গেনেকে তার খেলার ঘরে লাফালাফি,হৈচৈ করতে দেখা যায় কিছুক্ষন। তারপর মুহূর্তের বিরতি। এবার নিচু গলায় কথাবার্তার আওয়াজ ভেসে আসে পরিচারকদের কানে। প্রথমে গেনের বালকসুলভ কন্ঠ,তারপরই সম্পূর্ন ভিন্ন একটা কন্ঠ। এই সময় থেকেই অস্বস্তি শুরু হলো বাড়ির চাকর-বাকর এমনকি মিসেস অটোর মধ্যেও।  কখনো কখনো উদ্বিগ্ন মা আবিষ্কার করেন ছেলেটা জড়সড় হয়ে কামরার এক কোনায় বসে আছে। আর পুতুলটা বিছানায় কিংবা নিজের চেয়ারে বসে যেন একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। বাড়ির জিনিসপত্র মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যেতে লাগল। মনে হয় যেন কেউ ওগুলো ছুঁড়ে ফেলেছে। বাবা মা খুব বকাঝকাও করলো তাকে। তবে প্রতিবারই সে সাফাই গায়,রবার্ট ওটা করেছে। পুতুল নড়তে-চড়তে শিখে,একটার পর একটা অকান্ড ঘটাচ্ছে এটা কে-ই বা বিশ্বাস করবে ?গেনের এক দাদীর পরামর্শে রবার্টকে গেনের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে চিলেকোঠার একটা বাক্সে বন্দি করে রাখা হলো। তারপরের রাতেই বুড়ো মহিলাকে তার বিছানায় মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল। তবে ভদ্রমহিলার অপ্রত্যাশিত এই মৃত্যুর পরপরই রবার্ট আবার ফিরে পেল গেনের সঙ্গীর জায়গা। তারপর থেকে কোনো ঝামেলা ছাড়াই ওটা থাকতে লাগল এই বাড়িতে। গেনে অটো বিয়ে করার পর তাদের সম্পর্ক বেশিদিন টেকে না। একসময় উন্মত্ত আচরন শুরু করল মিসেস অটো। তারপর একদিন রহস্যময়ভাবে মারা যায়।একসময় মৃত্যু হলো গেনে অটোর।নতুন মালিক বাড়িটায় আসার পর আবার রবার্টের জায়গা হলো চিলেকোঠা একটা বাক্সে। কিন্তু প্রথমবারের মতই এই ব্যবস্থায় খুশি হতে পারল না অশুভ পুতুলটা। রাতগুলো দুর্বিষহ করে তুলল সে পরিবারটির জন্য। বাড়ির এখানে সেখানে তার উপস্থিতির নজির রাখতে শুরু করল। ঘটাতে থাকল একটার পর একটা অঘটন। দেরি না করে বাড়ি ছাড়লেন তারা। আর রবার্টের ঠাঁই হলো নতুন ঠিকানা, ওয়েস্ট ফ্লোরিডা মার্টেল্লো যাদুঘরে। যেখানে কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা হয় তাকে। এখনো জাদুঘরে ঘুরতে যাওয়া পর্যটকরা বলেন,রবার্ট সম্ভবত তার নতুন বাড়ির সঙ্গে ঠিক মানিয়ে নিতে পারেনি।এক নারী পর্যটক তার চোখের সামনে পুতুলটার মুখের ভঙ্গী দেখে আঁতকে ওঠেন। ঠিক আগের মুহূর্তে ওটা হাসছিল,তারপরই বিরক্ত হয়ে ভ্রুকুটি করে। আবার কোনো কোনো পর্যটক এমনও দাবি করেছেন বিখ্যাত পুতুলটার ছবি তোলার পর কালো ফ্রেম ছাড়া আর কিছুই পাননি। রবার্ট যে জায়গাটায় এখন আছে সেখানে আলোর অবস্থা বেশ খারাপ। এত কম আলোতে ছবি তোলা এমনিতেই কঠিন।কর্তৃপক্ষ জায়গাটকে আলোকিত করার জন্য নানা ধরনের ব্যবস্থা নিলেও কী এক অজানা কারনে সুবিধা হয়নি। আবার এধরনের গুজবও আছে ছবি তোলার আগে পুতুলটার কাছে ভদ্রভাবে অনুমতি চাইতে হয়। তা না হলে যে ছবি তুলবে তার উপর নেমে আসে রবার্টের অভিশাপ ।
রবার্ট দ্য ডল

Friday, 2 September 2016

শৈশবের যুদ্ধের গল্প থেকে স্নাইপারের কিংবদন্তি ভাসিলি জেইতসিভ পর্যন্ত


শৈশবের যুদ্ধের গল্প থেকে স্নাইপারের কিংবদন্তি ভাসিলি জেইতসিভ পর্যন্ত**  

শৈশবে বাবার কাছে শুনতাম প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আর ভিয়েতনামের যুদ্ধের গল্প। বাবার এই গল্পগুলো রোমাঞ্চে ভরা ছিল, কিন্তু একইসাথে যুদ্ধের বিভীষিকার এক নির্মম ছবি কল্পনায় ফুটিয়ে তুলত। ছোটবেলার একরকমের বিনোদন ছিল এই গল্পগুলো। আর বিনোদনের মাধ্যম বলতে তখন ছিল বাবার জাপানি প্যানাসনিক রেডিও। খবর, নাটক ছাড়াও আমাদের পছন্দের ছিল রেডিও চায়না।  

মাধ্যমিক শেষ করার পর যখন বাড়িতে এলো সাদাকালো নিপ্পন টিভি, তখন বিনোদনের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো। টিভিতে এক্স-ফাইলস আর হারকিউলিস দেখা শুরু হলো। এই সিরিজগুলো দেখে মফস্বলের ফুলবাড়ীতে বইয়ের দোকানে খুঁজে বেড়াতাম এ ধরনের গল্প। কোথাও ভিসিআর চললে একশান মুভির পোস্টারের নাম দেখে খাতায় টুকে রাখতাম। তখন থেকেই একশান মুভির প্রতি ভালো লাগা তৈরি হয়। কিন্তু যুদ্ধের সিনেমার প্রতি দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল বাবার রোমাঞ্চকর গল্পগুলো থেকেই।  

সময় গড়াতে গড়াতে হাতে এলো কম্পিউটার। তারপর এক সময় ইন্টারনেট সংযোগের সুবাদে ২য় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত সিনেমাগুলো দেখতে শুরু করি। ২০১১ সালে এমনই কিছু সিনেমা দেখার মধ্যে *এনিমি অ্যাট দ্য গেটস* আমাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে।  

প্রথমবার সিনেমাটি দেখে স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধের বিভীষিকাময় দিনগুলো যেন কল্পনায় দেখতে পেলাম। এর পরেও সিনেমাটি বারবার দেখা হয়। ততদিনে ২য় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে ব্যক্তিগত পড়াশোনাও বেশ এগিয়েছে। জেনেছি স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধ, হিটলারের সিক্স আর্মি, আর সোভিয়েতের রেড আর্মির কথা।  

স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধ এবং ভাসিলি জেইতসিভের সাহসিকতা  
মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর যুদ্ধ ছিল স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধ। ভোলগা নদীর তীরে ১৯৪২-৪৩ সালে এই যুদ্ধ হয়েছিল। সোভিয়েত স্নাইপার ভাসিলি জেইতসিভকে নিয়ে নির্মিত সিনেমা *এনিমি অ্যাট দ্য গেটস* এই যুদ্ধের এক অসাধারণ চিত্রায়ণ। সিনেমার নাম নেওয়া হয়েছে উইলিয়াম ক্রেগের লেখা বই থেকে, যেখানে স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।  

সিনেমাটিতে ভাসিলির সাহসিকতার গল্পকেই মূল ভিত্তি করা হয়েছে। এই স্নাইপার রাইফেল হাতে শত্রুদের ঘায়েল করে রেড আর্মির অন্যতম শক্তিতে পরিণত হন। ভাসিলি তার সাধারণ মানের মোসিন-নাগান্ত রাইফেল দিয়ে প্রায় ২৪২ জন প্রতিপক্ষ সেনাকে হত্যা করেন। অনেকের মতে, এই সংখ্যা পাঁচশরও বেশি।  

এনিমি অ্যাট দ্য গেটস সিনেমাটি যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ এবং মানবিক বিপর্যয় ফুটিয়ে তুলেছে। তবে বাস্তবের ভাসিলি জেইতসিভের কিংবদন্তি দুই ঘণ্টার কোনো সিনেমায় পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সিনেমাটিতে দেখানো হয়, কীভাবে সোভিয়েত রেড আর্মি কমরেডদের হাতে পর্যাপ্ত রাইফেল না থাকা সত্ত্বেও লড়াই চালিয়ে যায়। একদিকে লাশের স্তূপ, অন্যদিকে সীমিত গোলাবারুদ নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়া সোভিয়েত সৈনিকদের দৃশ্য গা শিউরে তোলে।  

জার্মান বাহিনী যখন ভাসিলির স্নাইপার বিগ্রেডের সামনে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তারা আরেকজন দক্ষ স্নাইপার পাঠায় তাকে হত্যা করতে। শুরু হয় দুই স্নাইপারের মধ্যে ভয়ঙ্কর লড়াই। ভাঙা ভবনের মধ্যে লুকিয়ে থেকে একে অপরকে পরাস্ত করার চেষ্টা যেন টম অ্যান্ড জেরি কার্টুনের মতো মনে হয়।  
 
যুদ্ধশেষে ভাসিলি রাষ্ট্রীয় বীরের মর্যাদা পান। তার ব্যবহৃত রাইফেলটি এখনো স্তালিনগ্রাদের ঐতিহাসিক জাদুঘরে সংরক্ষিত। সিনেমার শেষাংশে কিছু অতিরঞ্জিত রোমান্সের দিক থাকলেও, পরিচালক জ্যাঁ-জ্যাকস আন্নাউদ যুদ্ধের বিভীষিকাকে সফলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।  
  
এনিমি অ্যাট দ্য গেটস শুধু একটি সিনেমা নয়; এটি স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধের ভয়াবহ ইতিহাসের একটি প্রতিচ্ছবি। যুদ্ধের এই গল্প হৃদয়কে নাড়া দেয়, বিশেষত যারা ২য় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস এবং ভাসিলির মতো সাহসী যোদ্ধাদের জীবনের প্রতি আগ্রহী।